ধারাবাহিক প্রতিবেদন-১

জরিমানা দিয়েও ভেজাল পণ্য খাওয়াচ্ছে ‘ওয়েল ফুড’

জরিমানা দিয়েও ভেজাল পণ্য খাওয়াচ্ছে ‘ওয়েল ফুড’
18px
Dainik Ishanঈশান/প্রবি/বেবি২৭ এপৃল, ২০২৬, ২:০০ PM

রিমানা দিয়েও ভেজাল পণ্য খাওয়াচ্ছে ‘ওয়েল ফুড”। ছাড়ছে না ভেজাল পণ্য তৈরী। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠান ক্ষতিকর কেমিক্যাল দিয়ে খাদ্য উৎপাদন করে পণ্য বিক্রয় ও বিপণন করে আসছে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে। এ নিয়ে অভিযানে অসংখ্যবার জরিমানাও আদায় করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিকার ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

সংস্থা দুটির পর্যবেক্ষণ বলছে, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ওয়েল ফুডের উৎপাদিত কেক, মিষ্টি, পেস্ট্রিসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্যে রেডম্যান লেমন ইয়েলো কালার পেস্ট (ফুড গ্রেড কালার) ব্যবহার করা হচ্ছে। যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এসব ক্ষতিকর উপাদানের কারণে নানা রোগ হতে পারে। সংস্থাটি অভিযানে গিয়ে ভেজাল অপতৎপরতার প্রমাণ পাচ্ছে।

এমনটাই জানিয়েছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলার সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডল। তিনি বলেন, অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশে চট্টগ্রামে প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযানে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য বিক্রির দায়ে ওয়েল ফুডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

খাদ্যে ভেজাল রোধসহ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে কাজ করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, একাধিক অভিযানে ওয়েল ফুডের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে বহু মামলা ও জরিমানা আদায় করা হয়েছে। ওয়েল ফুড খাদ্য নিরাপত্তা আইনকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নোংরা পরিবেশে নিম্নমানের খাদ্য উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওয়েল ফুডের খাদ্য উৎপাদন স্থানে পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি মানারও কোনো কঠোরতা নেই। ফলে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

সংস্থা দুটির তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১১ এপৃল সর্বশেষ চট্টগ্রাম মহানগরীর কালুরঘাট বিসিক এলাকায় ওয়েল ফুডস লিমিটেডের কারখানায় মিষ্টি ও দইয়ে তেলাপোকার উপস্থিতি, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এবং কাঁচামালের রসিদ দেখাতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটিকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এই জরিমানা প্রতিষ্ঠানটির জন্য প্রথম শাস্তি নয়; প্রায় প্রতিবছর এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কোনো কিছুরই তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর জরিমানা দিয়েও ভেজাল পণ্য খাওয়াচ্ছে ওয়েল ফুড।

এর আগে ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগরীর শাহজাহানপুর থানা এলাকায় বিএসটিআইয়ের উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ওয়েল ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানিকে জরিমানা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি পণ্যের মান সনদ ছাড়া পাউরুটি, চানাচুর, জ্যাম ও আইসক্রিম উৎপাদন, বিক্রয়, বিতরণ ও বাজারজাত করার অপরাধে দোষী প্রমাণিত হয়।ত

এর আগে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর নগরীর জিইসি মোড়ে অবস্থিত ওয়েল ফুডে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের মোড়কে বিএসটিআই অনুমোদিত চিহ্ন না থাকা এবং ভোক্তাদের প্রতারণা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির আশঙ্কায় ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং অনুমোদনহীন পণ্য জব্দ করা হয়।

এরর আগে ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর চান্দগাঁও এলাকায় ওয়েল ফুডের কারখানায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে লেবেলবিহীন খাদ্যসামগ্রী, মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য এবং অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় খাবার তৈরির অপরাধে তিন লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

এছাড়া ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বিধিনিষেধ অমান্য করে রাত ৮টার পর দোকান খোলা রাখার অপরাধে ওয়েল ফুডকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। একই কারখানায় ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মিষ্টান্নজাতীয় খাদ্যদ্রব্য ও বেকারিপণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাত করার অপরাধে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এর আগে ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় নিবন্ধন সনদ ছাড়া খাদ্যপণ্য মোড়কজাতকরণ ও বিক্রি করায় ওয়েল ফুড ব্র্যান্ডকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর ঢাকা লালবাগের ওয়েল ফুডে মেয়াদহীন জন্মদিনের কেক বিক্রির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। যার কোনো মূল্য কিংবা উৎপাদনের তারিখ লেখা ছিল না।

এর আগে ২০১৬ সালের ১৬ জুন ড্রেনের পাশে খাবার তৈরি, সংরক্ষণ এবং দইয়ের মূল্য বেশি রাখার দায়ে জিইসি মোড়ের ওয়েল ফুডকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এভাবে প্রতিবছর কোন না কোন সময় ভেজাল পণ্য উৎপাদনসহ নানা কারণে লাখ লাখ টাকা জরিমানা দিচ্ছে ওয়েল ফুড। কিন্তু ভেজাল পণ্য উৎপাদন ছাড়ছে না। এরপরও দেশের বিশুদ্ধ, ভেজালমুক্ত এবং স্বাস্থ্যসম্মত বেকারি ও ফাস্ট ফুড পণ্যের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডের দাবিদার ‘ওয়েল ফুড লিমিটেড’।

চিকিৎসকদের মতে, খাদ্যপণ্যে ব্যবহৃত রেডম্যান লেমন ইয়েলো কালার পেস্ট (ফুড গ্রেড কালার) মানবদেহের জন্য মারাত্ন ক্ষতিকর। এসব ক্ষতিকর উপাদানের কারণে হার্ট, কিডনি ও লিভারজনিত নানা মারাত্নক রোগ হতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ বলেন, ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার এখন নিরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। ভেজাল মিশ্রিত খাবারগুলো আমাদের বিভিন্নভাবে আক্রান্ত করছে। অনিরাপদ খাদ্য শুধু স্বাস্থ্যের ঝুঁকিরই কারণ নয়, বরং দেহে রোগের বাসা বাঁধার অন্যতম কারণ। ডায়রিয়া থেকে শুরু করে ক্যানসারসহ দুই শতাধিক রোগের জন্য দায়ী অনিরাপদ খাদ্য।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু বলেন, বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য জরুরি হলেও তার চেয়ে বেশি জরুরি নিরাপদ খাদ্য। টেকসই জীবন ও সুস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প নেই। যারা সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে তাদের আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে যারা অনৈতিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করবে তাদের প্রতি আমরা জিরো টলারেন্স প্রদর্শন করছি। ভোক্তাদের স্বার্থে কোনো অসাধু ব্যবসায়ীকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

এ বিষয়ে জানতে ওয়েল ফুডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম কমুর মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। একাধিক পরিচালকের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কারো মোবাইল বন্ধ, আবার কেউ ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা দিয়েও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, ২০০১ সালে প্রথম চট্টগ্রাম থেকেই যাত্রা শুরু করে ওয়েল ফুড। চট্টগ্রামের কালুরঘাটে স্থাপন করা হয় ওয়েল ফুডের কারখানা। প্রতিষ্ঠাানটি দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগ্রুপ ওয়েল গ্রুপের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবদুচ সালাম এই শিল্পগ্রুপের কর্ণধার। তার প্রভাবে সে সময় রাতারাতি গজে উঠে প্রতিষ্টানটি। শুরু থেকে ভেজা্ল পণ্য তৈরী করে আসলেও সরকারি কেন সংস্থা এ প্রতিষ্ঠানে অভিযানের চিন্তাও করেননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রতিষ্টানটিতে একের পর এক অভিযান শুরু করে লাখ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এরপরও ভেজাল খাদ্য পণ্য তৈরী ছাড়ছে না প্রতিষ্ঠানটির মালিকেরা।

(এরপর আসছে ‘ওয়েল ফুডের’ ভ্যাট ট্যাক্স ফাঁকি নিয়ে দ্বিতীয় প্রতিবেদন)

ঈশান/প্রবি/বেবি

মন্তব্য করুন